কবিতা

কবিতা: নদীর স্বপ্ন, বুদ্ধদেব বসু_আবৃত্তিকার: সাবিহা ইসলাম জিকরা

আবৃত্তিকার: সাবিহা ইসলাম জিকরা

নদী-স্বপ্ন

বুদ্ধদেব বসু

 

কোথায় চলেছো ? এদিকে এসো না!

দুটো কথা শোনো দিকি,

এই নাও-এই চকচকে, ছোটো,

নতুন রুপোর সিকি।

ছোকানুর কাছে দুটো আনি আছে,

তোমায় দিচ্ছি তাও,

আমাদের যদি তোমার সঙ্গে

নৌকায় তুলে নাও।

নৌকা তোমার ঘাটে বাঁধা আছে-

যাবে কি অনেক দূরে?

পায়ে পড়ি, মাঝি, সাথে নিয়ে চলো

মোরে আর ছোকানুরে।

আমারে চেনো না? আমি যে কানাই।

ছোকানু আমার বোন।

তোমার সঙ্গে বেড়াবো আমরা

মেঘনা, পদ্মা, শোণ।

শোনো, মা এখন ঘুমিয়ে আছেন

দিদি গেছে ইশকুলে,

এই ফাঁকে মোরে-আর ছোকানুরে-

নৌকোয় নাও তুলে।

কোনো ভয় নেই-বাবার বকুনি

তোমায় হবে না খেতে,

যত দোষ সব আমরা-না, আমি

একা নেবো মাথা পেতে।

 

অনেক রঙের পাল আছে, মাঝি?

বেগুনি, বাদামি, লাল?

হলদেও?-তবে সেটা দাও আজ,

বেগুনিটা দিয়ো কাল।

সবগুলো নদী দেখাবে কিন্তু!

আগে পদ্মায় চলো,

দুপুরের রোদে ঝলমলে জল

বয়ে যায় ছলোছলো।

শুয়ে-শুয়ে দেখি অবাক আকাশ,

আকাশ ম-স্ত বড়ো,

পৃথিবীর সব নীল রং বুঝি

সেখানে করেছে জড়ো।

ঝাঁকে ঝাঁকে বেঁকে ঐ দ্যাখো পাখি

উড়ে চলে যায় দূরে

উঁচু থেকে ওরা দেখতে কী পায়

মোরে আর ছোকানুরে?

ওটা কী? জেলের নৌকা? তাই তো!

জাল টেনে তোলা দায়,

 

রূপোলি নদীর রূপোলি ইলিশ-

ইশ, চোখে ঝলসায়!

ইলিশ কিনলে? -আঃ, বেশ, বেশ,

তুমি খুব ভালো, মাঝি।

উনুন ধরাও, ছোকানু দেখাক

রান্নার কারসাজি।

পইঠায় বসে ধোঁয়া-ওঠা ভাত,

টাটকা ইলিশ-ভাজা-

ছোকানু রে, তুই আকাশের রানী,

আমি পদ্মার রাজা।

কবিতা : কোন এক মাকে, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ_আবৃত্তিকার : জান্নাতুর ফেরদাউস জুঁই

আবৃত্তি : জান্নাতুর ফেরদাউস জুঁই

কোন এক মাকে
-আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

 

“কুমড়ো ফুলে ফুলে
নুয়ে পরেছে লতাটা,
সজনে ডাঁটায়
ভরে গেছে গাছটা,
আর আমি
ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি।
খোকা তুই কবে আসবি ?
কবে ছুটি?”
চিঠিটা তার পকেটে ছিল
ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।

“মাগো, ওরা বলে
সবার কথা কেড়ে নেবে।
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।
বলো, মা,
তাই কি হয়?
তাইতো আমার দেরি হচ্ছে।
তোমার জন্যে
কথার ঝুরি নিয়ে
তবেই না বাড়ি ফিরবো।

লহ্মী মা,
রাগ ক’রো না,
মাত্রতো আর ক’টা দিন।”
“পাগল ছেলে,”
মা পড়ে আর হাসে,
“তোর ওপরে রাগ ক’রতে পারি !”
নারিকেলের চিড়ে কোটে,
উড়কি ধানের মুড়কি ভাজে,
এটা-সেটা
আর কত কী !
তার খোকা যে বাড়ি ফিরবে
ক্লান্ত খোকা।
কুমড়ো ফুল
শুকিয়ে গেছে,
ঝ'রে পড়েছে ডাঁটা,
পুঁই লতাটা নেতানো
“খোকা এলি ?”
ঝাপসা চোখে মা তাকায়
উঠানে উঠানে
যেখানে খোকার শব
শকুনীরা ব্যবচ্ছেদ করে।

এখন
মা’র চোখে চৈত্রের রোদ
পুরিয়ে দেয় শকুনীদের।
তারপর
দাওয়ায় ব’সে
মা আবার ধান ভানে,
বিন্নি ধানের খই ভাজে,
খোকা তার
কখন আসে কখন আসে!

এখন
মা’র চোখে শিশির-ভোর
স্নেহের রোদে ভিটে ভ’রেছে।