কবিতা

বিদ্রোহী

কাজী নজরুল ইসলাম

বল বীর –
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর –
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর –
আমি চির উন্নত শির!

আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর –
চির-উন্নত মম শির!

আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সমুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল্ ;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর।
বল বীর –
আমি চির-উন্নত শির!

আমি চির-দুরন্ত দুর্মদ,
আমি দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম্ হ্যায় হর্দম্ ভরপুর্ মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য;
আমি কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর –
চির – উন্নত মম শির!
আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক।
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার,
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড,
আমি চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।
আমি প্রাণ-খোলা হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু গ্রাস!
আমি কভূ প্রশান্ত,-কভূ অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহা কল্লোল,
আমি উজ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্জ্বল,
আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল-দোল!-
আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণু, তন্বী-নয়নে বহ্ণি
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বন্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ – জ্বালা, প্রিয় লান্চিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
চিত চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্!
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচড় কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!
আমি উথ্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ মর্ত্য-করতলে,
তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নিয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্ণি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সন্চারি ভুবনে সহসা সন্চারি’ ভূমিকম্প।
ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’ –
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’।
আমি দেব শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব মায়ের অন্চল!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!
আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরনীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা-
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!
আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়।
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না –
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি চির-বিদ্রোহী বীর –
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

 

বিদ্রোহী

কাজী নজরুল ইসলাম

আবৃত্তিকার : শাহ্ কামাল

আমি হবো

কাজী নজরুল ইসলাম

আমি হব সকাল বেলার পাখি 
সবার আগে কুসুম-বাগে উঠব আমি ডাকি। 
সূয্যিমামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে, 
'হয়নি সকাল, ঘুমো এখন'- মা বলবেন রেগে। 
বলব আমি, 'আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাক, 
হয়নি সকাল- তাই বলে কি সকাল হবে না কা! 
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে? 
তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!' 

ঊষা দিদির ওঠার আগে উঠব পাহাড়-চূড়ে, 
দেখব নিচে ঘুমায় শহর শীতের কাঁথা মুড়ে, 
ঘুমায় সাগর বালুচরে নদীর মোহনায়, 
বলব আমি 'ভোর হল যে, সাগর ছুটে আয়! 
ঝর্ণা মাসি বলবে হাসি', 'খোকন এলি নাকি?' 
বলব আমি নই কো খোকন, ঘুম-জাগানো পাখি!' 

ফুলের বনে ফুল ফোটাব, অন্ধকারে আলো, 
সূয্যিমামা বলবে উঠে, 'খোকন, ছিলে ভাল?' 
বলব 'মামা, কথা কওয়ার নাইক সময় আর, 
তোমার আলোর রথ চালিয়ে ভাঙব ঘুমের দ্বার।' 
রবির আগে চলব আমি ঘুম-ভাঙা গান গেয়ে, 
জাগবে সাগর, পাহাড় নদী, ঘুমের ছেলেমেয়ে!

 

খোকার সাধ

কাজী নজরুল ইসলাম

আবৃত্তিকার: তামজিদ নিয়াজ

নেশা

মোফাজ্জল করিম

বাপজান আশা করি কুশলেই আছেন,

পরসমাচার এই যে,

সেদিন আপনি যে কান্ডটা করিলেন

তার জন্য এই পত্রটি না লিখিয়া পারিতেছিনা

দেখিতেছি যতই বয়স বাড়িতেছে, ততই আপনার কান্ড

একেবারেই লোপ পাইতেছে!

 

আপনি কি করিয়া সেদিন আমার ড্রইংরুমে,

অর্থাৎ বৈঠকখানায় বেমোক্কা ঢুকিয়া পড়িলেন,

বুঝিলাম না

সারাগায়ে ঘামের গন্ধ, ময়লা তেল চিপচিপে পান্ঞ্জাবী,

বগলে ছেঁড়া ছাতা, মাথায় চিতিপড়া কিস্তি টুপি,

যেনো আকবর বাদশার উর্নিশ আর কি!

হাতে মাটির হাড়ি, সর্বোপরি দু’পায়ের চামড়ার

কুচ কুচে কালো রং, বোধহয় লজ্জায় ঢাকিয়া ফেলিবার

আশায়, রাস্তার সবটুকু ধুলি মাখাইয়া

পা দু’টিকে মনে হইতেছিল চুনকাম করাইয়াছেন।

কি লজ্জা, আপনার ঐমূর্তি দেখিয়া আমার বন্ধুগন

এবং তাদের সুন্দরী স্ত্রীরা, বজ্রাহতের মতো তাকাইয়া রহিলো।

যেনো তাহারা চাক্ষুস ভুত দেখিতেছে

আর আমার অবস্হাটা একবার ভাবিয়া দেখুন,

মান, সম্মান, মর্যাদা সব জাহান্নামে গেল,

তাও-না হয়, আপনি যদি দয়া করিয়া একটু চুপ থাকিতেন

তবু একটা কথা ছিল!

তা-না আপনার আবার আহল্লাদে মুখ দিয়া

কথার ফোয়ারা ছুটিতে লাগিলোঃ

“বাবা কেমন আছো? বৌমা কোথায়?”

বলিহারে ভাগ্যিস সেই মুহুর্তে ও সেখানে ছিল না!

থাকিলে সে বেচারির হার্ট এটাক হইয়া যাইতো,

সে তো আবার হঠাৎ কোনো খারাপ দৃশ্য

মোটেই সহ্য করিতে পারেনা,

বড় কোমল হৃদয়ের মানুষ কিনা!

বাপজান তোমাকে সাবধান করিয়া দিতেছি

আর যাই করো, এইভাবে আমাকে ডুবাইয়ো না

টাকা-পয়সা লাগিলে চিঠি দিও পারিলে পাঠাইবো,

আর অতো টাকা পয়সাও যে কেন লাগে তোমাদের তাও বুঝিনা

তোমাদের আবার অতো খরচ কিসের

ক্লাবে যাওনা, পার্টি দাওনা

ইসুবগুল, আর চিরতার পানি ছাড়া

আরতো কোনো নেশাও করো না।

এইটুকু পড়িয়া দরিদ্র স্কুল মাস্টার

পিতা আনমনে বলিয়া উঠিলেনঃ

না, না ভুল বললিরে বাবা

নেশা একটা আছে, বড় পুরানো নেশা

কিছুতেই ছাড়িতে পারিনা সেই নেশা

তোর জন্মের পর থেকে সারাক্ষণ তোকে দেখার নেশা

কিছুতেই ছাড়িতে পারিনা বাপ, কিছুতেই ছাড়িতে পারিনা।।

 

নেশা

মোফাজ্জল করিম

আবৃত্তিকার : রয়হানুল ইসলাম

খাদু দাদু

কাজী নজরুল ইসলাম

ও মা! তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং?
খ্যাঁদা নাকে নাচছে ন্যাদা- নাক ড্যাঙ্গা-ড্যাং- ড্যাং! 

ওঁর নাকতাকে কে করল খ্যাঁদ্যা রাঁদা বুলিয়ে?
চামচিকে- ছা ব'সে যেন ন্যাজুড় ঝুলিয়ে।
বুড়ো গরুর টিকে যেন শুয়ে কোলা ব্যাং।
অ মা! আমি হেসে মরি, ন্যাক ডেঙ্গাডেং ড্যাং। 

ওঁর খ্যাঁদা নাকের ছ্যাঁদা দিয়ে টুকি কে দেয় 'টু'!
ছোড়দি বলে সর্দি ওটা, এ রাম! ওয়াক! থুঃ!
কাছিম যেন উপুড় হয়ে ছড়িয়ে আছেন ঠ্যাং!
অ মা! আমি হেসে মরি, ন্যাক ডেঙ্গাডেং ড্যাং। 

দাদু বুঝি চিনাম্যান মা, নাম বুঝি চাং চু,
তাই বুঝি ওঁর মুখটা অমন চ্যাপটা সুধাংশু।
জাপান দেশের নোটীশ উনি নাকে এঁটেছেন!
অ মা! আমি হেসে মরি, ন্যাক ডেঙ্গাডেং ড্যাং। 

দাদুর নাকি ছিল না মা অমন বাদুড়- নাক
ঘুম দিলে ঐ চ্যাপটা নাকেই বাজতো সাতটা শাঁখ।
দিদিমা তাই থ্যাবড়া মেরে ধ্যাবড়া করেছেন!
অ মা! আমি হেসে মরি, ন্যাক ডেঙ্গাডেং ড্যাং। 

লম্ফানন্দে লাফ দিয়ে মা চলতে বেঁজির ছা
দাড়ির জালে প'ড়ে দাদুর আটকে গেছে গা,
বিল্লি- বাচ্চা দিল্লি যেতে নাসিক এসেছেন!
অ মা! আমি হেসে মরি, ন্যাক ডেঙ্গাডেং ড্যাং। 

দিদিমা কি দাদুর নাকে টাঙাতে 'আলমানাক'
গজাল ঠুঁকে দেছেন ভেঙ্গে বাঁকা নাকের কাঁখ?
মুচি এসে দাদুর আমার নাক করেছেন 'ট্যান'!
অ মা! আমি হেসে মরি, ন্যাক ডেঙ্গাডেং ড্যাং। 

বাঁশির মতন নাসিকা মা মেলে নাসিকে,
সেথায় নিয়ে চল দাদু দেখন -হাসিকে!
সেথায় গিয়ে করুন দাদু গরুড় দেবের ধ্যান,
খাঁদু দাদু নাকু হবেন, নাক ডেঙ্গাডেং ড্যাং।

 

খাদু দাদু

কাজী নজরুল ইসলাম

আবৃত্তিকার : হুমায়রা আফনান নাবা

তদন্ত

মাহমুদ দারবিস

হ্যাঁ, লেখো
আমি একজন আরব
আমার কার্ড নম্বর পঞ্চাশ হাজার
আমার আটটি সন্তান 
নবমটি পরবর্তি গ্রীষ্মে জন্মাবে,
তুমি কি রাগ করলে?

লেখো 
আমি এক আরব
সাথী শ্রমিকের সাথে আমি পাথর ভাঙি
অমানুষিক পরিশ্রমে আমি পাথুরে পাহাড় ভেঙ্গে 
নুড়ি করি-
এক টুকরো রুটির জন্যে 
আমার আট সন্তানের একখানি বইয়ের জন্যে
কিন্তু আমি দয়া-দক্ষিণা চাইনা
আর তোমার কর্তৃত্বের কাছে মাথা নোয়াইনা
তুমি কি রাগ করলে?

লেখো, হ্যাঁ লিখে নাও
আমি একজন আরব 
আমি  উপাধিহীন একটি নাম 
উন্মত্ত পৃথিবীতে এখনও স্থির
স্থান ও কালের সীমানা ছাড়িয়ে
আমার শিকড় খুব গভীরে প্রোথিত
আমি কৃষকের সন্তান।
নলখাগড়া ও খড়ের তৈরী কুঁড়েঘরে
আমি বাস করি,
চুল আমার মিশকালো,
চোখঃ বাদামী
আমার আরবী শিরোভূষণ
কেড়ে নিয়েছে অনুপ্রবেশকারীর হাত,
আমি পছন্দ করি বোজ্য তেল ও সুগন্ধি লতাগুল্ম

লেখো
এবং সবার উপরে
দয়া ক’রে লিখে রাখো –
আমি কাউকে ঘৃণা করিনা
আমি কেড়ে নিইনি কারো সমুহ সম্পদ,
কিন্তু, আমি যখন অনাহারী
নির্দ্বিধায় ছিঁড়ে খাই 
আমার সর্বস্ব-লুন্ঠনকারীর মাংশ
আতএব, সাবধান 
আমার ক্ষুধাকে সাবধান
আমার ক্রোধকে সাবধান।

যারা শুধু ধ্বংস করে 
মানুষ খুন করার নেশায় পাগল হয়ে যায় 
সেই বর্বরদের বিরুদ্ধেই কেবল আমরা অস্ত্র ধরি।
পৃথিবীটাই বদলে গেছে,
প্রবল ভূমিকম্পে উপত্যকার পুষ্প ঝ’রে যাক
তীক্ষè ছুরি সংক্ষিপ্ত করুক পাখির কলগীতি 
বারুদের গুঁড়োয় পুড়ে যাক শিশুদের ভ্রু-পল্লব-
মানুষের খুলির ওপর, ধ্বংসের ওপর 
সর্বনাশা হায়েনার ছোবলে ছেঁড়াখোড়া জঞ্জালের ওপর 
স্ফুলিঙ্গের জন্ম হোক
ভয় নেই, প্রতিটি গৃহে তলোয়ারের টোকা পড়বে।

এসো, তীব্র ঘৃণা এবং ক্রোধের নতুন ঘাম পান কর
এই যুদ্ধ তোমার রক্তে আনুক নতুন জোয়ার
মুখ থেকে তোমার নেকাব খুলে পড়ুক
আজ তোমার মুখ জ্বলন্ত ফুলের মতো
তোমার বোবা অধর বিজয়ের লাল গোলাপের মত।
যদিও তোমার টাটকা জখম থেকে ধোঁয়া উঠছে 
আর তার স্বাদ নোনতা
তবু প্যালেস্টাইন, প্যালেস্টাইন আমার, তোমার জয় হোক।

তুমি নিজেই আজ জানাজার কাফন হয়ে যাও 
হয়ে যাও রক্তাক্ত ক্রোধ 
হয়ে যাও বিভৎস রোষ 
তোমার শিরায় শিরায় রক্তের বদলে ব’য়ে যাক নীল গরল
ক্ষমাহীন ঘৃণা 
আর তীব্র জ্বালা
আরব জনগণের কাছ থেকে হতাশা তো কবেই পালিয়েছে
আর আমাদের ধৈর্য এখন টগবগ করে ফুটছে
প্রতিটি বদ্ধমুষ্টি ছিঁড়ে ফেলছে সমস্ত বন্ধন
ঘোর আঁধার ভেঙ্গে উদিত হচ্ছে নতুন দিন
সমবেত আকাক্সক্ষা দীর্ঘতর হচ্ছে বিধানের বন্দনায়,
নির্মল সতেজ ডানা জীবন্ত আর সবুজ
অপেক্ষার ধনুক অধৈর্য 
শব সন্ধানী উড্ডীন ঈগলে হায়েনার ক্ষুুধার্ত দাঁত অপেক্ষমান 
কত আর অপেক্ষায় থাকব?
পাথরের সুউচ্চ পিরামিড অগ্নিবানে অধৈর্য
কোলাহল-মুখর বিমান বন্দর যেন ঘাতকের নাসিকার গর্জন
প্যালেস্টাইন, তোমার প্রতিটি গৃহই এখন দূর্গ
তোমার প্রতিটি কম্যান্ডো-সন্তান
রণক্ষেত্র থেকে বিজয়ী হয়ে ফিরে আসবে
স্বাধীনতা পাওয়ার আনন্দাশ্রু ঝ’রে-ঝ’রে 
পড়বে তোমার গাল বেয়ে,
প্যালেস্টাইন,
তখনই তোমার গগনফাটা উল্লাস।

 

তদন্ত

মাহমুদ দারবিস

অনুবাদক: রফিক আজাদ

আবৃত্তিকার : আবু দাউদ মু. আরেফিন

মানুষ

কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান–
মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান ,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ
ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের
জ্ঞাতি ।
‘পুজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পুজার সময়
হলো !’
স্বপ্ন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
দেবতার বরে আজ রাজা-
টাজা হয়ে যাবে নিশ্চয় !
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা,
খাইনা তো সাত দিন !’
সহসা বন্ধ হল মন্দির , ভুখারী ফিরিয়া চলে
তিমির রাত্রি পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক
জ্বলে !
ভুখারী ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পুজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয় !’
মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই
কুটিকুটি !
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে-আজারির চিন্
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা ফাকা আছি আজ
নিয়ে সাত দিন !’
তেরিয়াঁ হইয়া হাঁকিল
মোল্লা–”ভ্যালা হলো দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গে-ভাগাড়ে গিয়ে ! নামাজ পড়িস
বেটা ?”
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা !’ মোল্লা হাঁকিল-
‘তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ !’ গোস্ত-
রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা !
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে–
“আশিটা বছর কেটে গেল,
আমি ডাকিনি তেমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু !
তব মজসিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল
দুয়ারে চাবী !”
কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায়
কালাপাহাড় ;
ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-
দ্ব ার !
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায় কে দেয়
সেখানে তালা ?
সব দ্বার এর খোলা র’বে, চালা হাতুড়ি শাবল
চালা !
হায় রে ভজনালয়
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের
জয় !
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল
চুম্বিছে মরি মরি
ও মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর
করে কেড়ে
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই
মানুষেরে মেরে ।
পুজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল !–মুর্খরা সব শোনো
মানুষ এনেছে গ্রন্থ,–গ্রন্থ আনেনি মানুষ
কোনো ।
আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এরা পিতা পিতামহ, এই আমাদের
মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-
বেশী করে প্রতি ধমনীতে বাজে !
আমরা তাঁদেরি সন্তান , জ্ঞাতি ,
তাঁদেরি মতন দেহ
কে জানে কখন মোরাও
অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ ।
হেস না বন্ধু ! আমার আমি সে কত অতল অসীম
আমিই
কি জানি কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম

হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি,
তোমাতে মেহেদি ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার
দিশা ?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই,
কাহারে মারিছ লাথি ?
হয়তো উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন
দিবারাতি !
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ –
দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজানালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয় !
হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর -বাসে
জন্মিছে কেহ-জোড়া নাই যার জগতের
ইতিহাসে !
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ,
যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখেনি–হয়ত আসিছে সে এরই
ঘরে !
ও কে ? চন্ডাল ? চমকাও কেন ? নহে ও ঘৃণ্য
জীব !
ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব

আজ চন্ডাল, কাল হতে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে,
করিবে নান্দী পাঠ ।
রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা, ও-
হেলা কাহারে বাজে !
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল
সাজে !
চাষা বলে কর ঘৃণা !
দেখো চাষা রুপে লুকায়ে জনক বলরাম
এলো কি না !
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারও ধরিল হাল
তারাই আনিল অমর বাণী–
যা আছে র’বে চিরকাল ।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায়
নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা -নাথ
গিরিজায়া, তা কি চিনি !
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-
মুষ্টি দিলে
দ্বার দিয়ে তাই মার
দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলৈ ।
সে মোর রহিল জমা -
কে জানে তোমারে লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু’চোখ স্বার্থ ঠুলি,
নতুবা দেখিতে,
তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলী ।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা মথিত
সুধা
তাই লুটে তুমি খাবে পশু ?
তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা ?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই
জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের
কোনখানে !
তোমারি কামনা-রাণী
যুগে যুগে পশু ফেলেছে তোমায় মৃত্যু
বিবরে টানি ।

 

 

মানুষ

কাজী নজরুল ইসলাম

আবৃত্তিকার :ফারজানা রেজা স্নিগ্ধা